হুমায়ূন আহমেদ এর মায়ের মজার ঘটনা!

"মা তখন খুবই অসুস্থ। কিডনি প্রায় অকেজো। বিছানায় বসে থেকেই ঘুমিয়ে পড়েন। ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় না। একদিন হঠাৎ অচেতন হয়ে গেলেন। অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে ল্যাব এইড হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। তাকে CCU-তে রাখা হলো। ডাক্তার বরেন চক্রবর্তীর রোগী। তার জ্ঞান ফিরল রাত তিনটায়। তিনি দেখলেন, সবুজ পর্দা ঘেরা একটা ঘরে তিনি শুয়ে আছেন। আরামদায়ক আবহাওয়া। তার সামনে সবুজ পোশাক পরা দু’টি রূপবতী (এবং বেঁটে) তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। [এরা নার্স। মার খোঁজ নিতে এসেছিল।]

মা’র ধারণা হলো তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুর পর তার বেহেশত নসিব হয়েছে। কারণ বেহেশত সবুজ, এই খবর তিনি জানেন। মেয়ে দুটি যে হুর এটাও বুঝা যাচ্ছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্যে তিনি হুরদের জিজ্ঞেস করলেন, মা, এটা কি বেহেশত?
হুর দু’জন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে রোগীকে সন্তুষ্ট করার জন্যে বলল, জি খালাম্মা।
মা বললেন, তোমরা আমাকে বেহেশতের আঙ্গুর এনে দাও তো। খেয়ে দেখি কী অবস্থা।
হুর দু’জন আঙ্গুর নিয়ে এলে কী হতো আমি জানি না। তার আগেই ডিউটি ডাক্তার ঢুকলেন এবং বললেন, খালাম্মার জ্ঞান ফিরেছে। আপনার ছেলেমেয়েরা সবাই বাইরে আছে। ডেকে দেই কথা বলেন।
এই ঘটনার পর একদিন মাকে বললাম, আপনার কি খুব বেহেশতে যাওয়ার ইচ্ছা?
মা বললেন, হ্যাঁ।
আমি বললাম, আপনি তো লোভী মহিলা না। বেহেশতের লোভ কেন করছেন?
মা বললেন, বেহেশতে না গেলে তোর বাবার সঙ্গে তো দেখা হবে না। তোর বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্যেই বেহেশতে যেতে চাই।
আমি বললাম, প্রথম দেখাতে তাকে কী বলবেন?
বলব, ছয়টা ছেলেমেয়ে আমার ঘাড়ে ফেলে তুমি চলে গিয়েছিলে। আমি দায়িত্ব পালন করেছি। এদের পড়াশোনা করিয়েছি। বিয়ে দিয়েছি। এখন তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করবে। বেহেশতের সুন্দর সুন্দর জায়গাগুলি আমাকে দেখাবে। শুধু আমরা দু’জন ঘুরব। তুমি তোমার সঙ্গের হুরগুলিকে বিদায় করো।
মৃত্যু একটি ভয়াবহ ব্যাপার। যখন মাকে দেখি সেই ভয়াবহ ব্যাপারটির জন্যে তিনি আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করছেন, অবাক লাগে।
বই: হিজিবিজি
লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
লেখা সংগৃহীত।